ঢাকাশুক্রবার , ৩০ জানুয়ারি ২০২৬

টেংরাটিলা বিস্ফোরণে দায়ী নাইকোকে: সোয়া ৪ কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে

আন্দোলন ডেস্ক
জানুয়ারি ৩০, ২০২৬ ১২:২০ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

ছাতকের টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে বিস্ফোরণের ঘটনায় নাইকো রিসোর্সেসের বিপক্ষে রায় পেয়েছে বাংলাদেশ। কানাডীয় কোম্পানিটিকে ৪ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দিয়েছে বিশ্ব ব্যাংকের আন্তর্জাতিক আন্তর্জাতিক সালিশি প্রতিষ্ঠান।

ভয়াবহ এ দুর্ঘটনার জন্য টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে গ্যাস অনুসন্ধানের দায়িত্বে থাকা নাইকো রিসোর্সকে দায়ী করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউটস (ইকসিড) গত ১৮ ডিসেম্বর এ রায় দিয়েছে বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রায়ত্ত পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান রেজানুর রহমান। তিনি বলেন, রায় আগে হলেও বুধবার ক্ষতিপূরণের অর্থের বিষয়ে পেট্রোবাংলা জানতে পেরেছে।

আন্তর্জাতিক সালিশি ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশের পক্ষে রায় দিয়েছে তুলে ধরে তিনি বলেন, রায়ে কানাডীয় কোম্পানিটিকে ৪২ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি পাওয়ার পর আইন অনুযায়ী মতামত নেওয়া হবে। সে অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করা হবে।

এ বিস্ফোরণের ঘটনায় গ্যাসক্ষেত্রে প্রায় ৮ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পুড়ে যাওয়ার ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৪ কোটি ২০ লাখ ডলার এবং পরিবেশগত ক্ষতির জন্য আরও ২০ লাখ ডলার পরিশোধ করতে হবে নাইকোকে বলে রায়ে বলা হয়েছে।

রায়ে ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ’ অর্থাৎ ক্ষতির পরিমাণ ও ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের নির্দেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল। ২০০৫ সালের ৫ জানুয়ারি এবং ২৪ জুন টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে দুই দফা বিস্ফোরণে বিপুল পরিমাণ গ্যাসের মজুত পুড়ে যায়। পাশাপাশি বিস্তীর্ণ এলাকায় সম্পদ ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হয়। পরে এ ঘটনায় ক্ষতিপূরণ দাবি করে পেট্রোবাংলা। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ২০১৬ সালের মার্চে ইকসিডে ক্ষতিপূরণ দাবি করে। এতে বাপেক্সের জন্য ১১ কোটি ৮০ লাখ ডলার এবং পেট্রোবাংলা ও বাংলাদেশের জন্য ৮৯ কোটি ৬০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়।

শুনানিতে গ্যাস রিজার্ভের ক্ষতি, পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি এবং টেংরাটিলার গ্যাস উত্তোলন করতে না পারায় বিকল্প উৎস থেকে গ্যাস কিনতে সরকারের আর্থিক ক্ষতির বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রের উন্নয়নে ২০০৩ সালে রাষ্ট্রীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের সঙ্গে চুক্তি করে কানাডীয় কোম্পানি নাইকো। চুক্তির আওতায় অনুসন্ধান কূপ খননের সময় ২০০৫ সালের জানুয়ারি ও জুন মাসে দুই দফা বিস্ফোরণ ঘটে। সবশেষ রায়ের বিষয়ে পেট্রোবাংলা বলছে, বিস্ফোরণের ফলে গ্যাস সম্পদ ও সম্পত্তির ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে ‘হেড অব লস’ চিহ্নিত করতে আইসিএসআইডিতে শুনানি হয়। এতে দাবির পক্ষে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও যুক্তি উপস্থাপন করা হয়। ওয়াশিংটন ডিসি থেকে পরিচালিত ওই শুনানিতে বাংলাদেশের সাত সদস্যের একটি প্যানেল অংশ নেয়।

পেট্রোবাংলা বলছে, মামলাটি মূলত দুই ধাপে নিষ্পত্তি হয়। প্রথম ধাপে ট্রাইব্যুনাল রায় দেয়, বিস্ফোরণের জন্য নাইকো দায়ী। দ্বিতীয় ধাপে সেই অবহেলার ফলে গ্যাস সম্পদ ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়। বাংলাদেশ এক বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করলেও দীর্ঘ শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল ক্ষতিপূরণের অঙ্ক অর্ধেকের চেয়েও কমিয়ে চূড়ান্ত রায় দেয়। ক্ষতিপূরণ দুটি খাতে নির্ধারণ করা হয়েছে, গ্যাস সম্পদের ক্ষতি এবং পরিবেশগত ক্ষতি। বিস্ফোরণের ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়নের জন্য বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আইন প্রতিষ্ঠান ফোলি হোয়াগ এলএলপিকে নিয়োগ দেয়। ২০১০ সালের মে মাসে নাইকো পরিচালিত ফেনী গ্যাসক্ষেত্র বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর টেংরাটিলার ক্ষতিপূরণ আদায় না হওয়ায় গ্যাস বিল বাবদ পাওনা ২ কোটি ৭০ লাখ ডলার আটকে দেয় পেট্রোবাংলা। একই সঙ্গে টেংরাটিলায় নাইকোর সম্পদও জব্দ করে রাখা হয়।

এরপর নাইকো ইকসিডে দুটি মামলা করে একটি গ্যাসের বকেয়া বিল আদায় সংক্রান্ত এবং অন্যটি টেংরাটিলা বিস্ফোরণে ক্ষতিপূরণ দাবির বৈধতা নিয়ে। এর মধ্যে ক্ষতিপূরণ দাবির বিরুদ্ধে নাইকোর আবেদন ২০১৩ সালের আগস্টে খারিজ করে দেয় ট্রাইব্যুনাল।

পরের বছর আরেক রায়ে বলা হয়, টেংরাটিলার ক্ষতিপূরণের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের কাছে পাওনা অর্থ পাবে না নাইকো। পরে ট্রাইব্যুনালের বিচারিক এখতিয়ার নিয়ে নাইকোর আপত্তিও ২০১৯ সালে খারিজ হয়।