ঢাকাসোমবার , ১০ নভেম্বর ২০২৫

বিএনপি ছাড় দিলেও এনসিপির জেতা কঠিন

মো. শফিকুল ইসলাম
নভেম্বর ১০, ২০২৫ ২:৩১ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে এখনো অনেকের সংশয় রয়েছে। বিশেষ করে রাজনীতির নানা মারপ্যাঁচ হিসেব-নিকেশ করে সংশয়ের কথা বলছেন বিশ্লেষকরা। তবে নির্বাচন ইস্যুতে অর্ন্তবর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ‘কঠোর’ অবস্থানের কারণে রাজনৈতিক দলগুলো সেই সংশয়কে খুব একটা আমলে নিচ্ছে না। এর প্রমাণ মেলে দলগুলোর মনোনয়ন ইস্যুতে। বেশ কিছুদিন আগেই প্রার্থী ঘোষণা করেছে মাঠ দাপিয়ে বেড়ানো জামায়াতে ইসলামী। এরই ধারাবাহিকতায় বিএনপি দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেছে। রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ৩ নভেম্বর মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেন। এই তালিকাকে চূড়ান্ত ধরা যায়। কারণ সেখানে খুব একটা পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই। ২৩৭টি আসনে বিএনপি প্রার্থী দিয়েছে। এখনো ফাঁকা রয়েছে ৬৩টি। এগুলোর বেশিরভাগ যুগপৎ আন্দোলনে থাকা দলগুলোর জন্য ছেড়ে দেওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে।

গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) ওই ৬৩ আসনের ভাগিদার হতে পারে। বিষয়টি নিয়ে দল দুটির শীর্ষ পর্যায়ে আলোচনা চলছে। এখন পর্যন্ত অনানুষ্ঠানিক যে আলোচনা, তাতে এনসিপি ঢাকায় ৪টিসহ অন্তত ২০টি আসন নিয়ে বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা চায়। এসব আসনের অনেকগুলোতেই বিএনপি প্রার্থী ঘোষণা করলেও অনানুষ্ঠানিক আলোচনা বা যোগাযোগ চলছে। দুই দলের মধ্যে বোঝাপড়া হলে সংশ্লিষ্ট আসনগুলোতে বিএনপি প্রয়োজনে প্রার্থী তুলে নেবে। কেবল আসন সমঝোতা নয়; এনসিপির নেতারা নিজেদের ভবিষ্যতের নিরাপত্তার বিষয়ে একটা নিশ্চয়তা চান। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে এনসিপি থেকে তিনজনকে মন্ত্রী করার কথাও অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় তুলেছেন তারা। বিএনপির দিক থেকে স্পষ্ট করে এখনো কিছু জানানো হয়নি। তবে বিএনপি চায় না এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে কোনো নির্বাচনী জোটে বা সমঝোতায় যাক। (প্রথম আলো, ৫ নভেম্বর ২০২৫)।

এনসিপির ব্যাপারে জামায়াতেরও আগ্রহ রয়েছে। জামায়াত বিএনপির চেয়েও বেশি ছাড় দিতে চায়। কিন্তু এনসিপির নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কারও কারও মত হচ্ছে, নতুন এই দলটি ‘ডানপন্থী’ তকমা গায়ে লাগাতে চাইছে না। তারা নিজেদের মধ্যপন্থী হিসেবে পরিচিত করতে আগ্রহী। নির্বাচনী জোট বা সমঝোতা নিয়ে ২ নভেম্বর সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমাদের মৌলিক দাবিগুলোর সঙ্গে যারা কাছাকাছি আছে, এ রকম দলের সঙ্গে আমাদের যদি ঐক্যবদ্ধ হতে হয় বা কোনো ধরনের সমঝোতায় যেতে হয়, তাহলে সেটা আমরা বিবেচনায় রাখব।’

ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে গত মঙ্গলবার ‘কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি’ গঠন করেছে এনসিপি। এই কমিটির প্রধান করা হয়েছে দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে আর সেক্রেটারি হয়েছেন দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা। আরও ১০ জন নেতাকে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য করা হয়েছে। এনসিপির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে সার্বিক প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা, প্রার্থী বাছাই, মাঠপর্যায়ের সমন্বয়, আইনি ও প্রশাসনিক কার্যক্রম, মিডিয়া ও প্রচারণা এবং প্রশিক্ষণ ও মনিটরিংয়ের লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এনসিপির নেতারা বলছেন, দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ঢাকা-১১ আসন থেকে নির্বাচন করতে চান। সদস্যসচিব আখতার হোসেন নির্বাচন করবেন রংপুর-৪ আসন থেকে। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর আগ্রহ ঢাকা-১৮ অথবা চাঁদপুর-৫। তাসনিম জারা ঢাকা-৯ আসন থেকে এবং জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব ঢাকা-১৪ আসন থেকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম পঞ্চগড়-১ আসন থেকে আর দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ কুমিল্লা-৪ আসন থেকে নির্বাচন করতে চান। দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদ নোয়াখালী-৬ আসন থেকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এসব আসনের মধ্যে শুধু ঢাকা-৯ ও ঢাকা-১৮ আসন ছাড়া সব কটিতেই প্রার্থী দিয়েছে বিএনপি। তবে এই দুই আসন তারা এনসিপির প্রার্থীদের জন্য ফাঁকা রেখেছে কি না, তা জানা যায়নি।

এর বাইরে এনসিপির আরও অর্ধশতাধিক কেন্দ্রীয় নেতা নির্বাচন করতে চান। তাদের মধ্যে মনিরা শারমিন নওগাঁ-৫, সারোয়ার তুষার নরসিংদী-২, আতিক মুজাহিদ কুড়িগ্রাম-২, আবদুল্লাহ আল আমিন নারায়ণগঞ্জ- ৪, এস এম সাইফ মোস্তাফিজ সিরাজগঞ্জ-৬, আশরাফ উদ্দীন মাহাদী ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ এবং জয়নাল আবেদীন শিশির কুমিল্লা-১০ আসন থেকে নির্বাচন করতে আগ্রহী।
ছাত্রদের প্রতিনিধি হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকারে আছেন উপদেষ্টা মাহফুজ আলম ও আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। তারা সরাসরি এনসিপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না। তবে দলটির বিভিন্ন সিদ্ধান্তে তাদের প্রভাব থাকে।

বিএনপির সঙ্গে আসন সমঝোতা হলে সরকার থেকে পদত্যাগ করে ঢাকা-১০ আসন থেকে নির্বাচন করতে আগ্রহী আসিফ মাহমুদ। সেটা এনসিপির মনোনয়নে হতে পারে, স্বতন্ত্রভাবেও হতে পারে। আর বিএনপির সঙ্গে বোঝাপড়া হলে মাহফুজ আলম লক্ষ্মীপুর-১ আসন থেকে নির্বাচন করতে আগ্রহী। বিএনপি ঢাকা-১০ ও লক্ষ্মীপুর-১ আসন ফাঁকা রেখেছে। তবে সেটি এই দুই উপদেষ্টার জন্যই কি না, তা সময়ই বলে দেবে। তবে লক্ষ্মীপুর-১ আসনে বাংলাদেশ এলডিপির চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সেলিম জোটের প্রার্থী হিসেবে বিএনপি থেকে অনেকটাই সবুজ সংকেত পেয়েছেন।

এখন প্রশ্ন হলো বিএনপি ছাড় দিলেই কী এনসিপির প্রার্থী বিজয়ী হয়ে আসতে পারবেন? এই প্রশ্নের উত্তর হলো- সেটা সহজ নয়। কেননা, বিএনপি একটা বড় দল। প্রত্যেকটি আসনে তাদের বেশ কয়েকজন এমপি হওয়ার যোগ্য নেতা আছেন। এরই মধ্যে মনোনয়ন না পেয়ে বিভিন্ন জায়গায় বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। ধরে নেওয়া যাক- এনসিপি কিংবা অন্য দলকে বিএনপি ছাড় দিল। যদি দলটির কোনো নেতা সেখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন, তাকে কী দল থামাতে পারবে? অবশ্যই পারবে না। তাহলে নেতাকর্মীরা ওই নেতার পক্ষেই কাজ করবেন। তারা অন্যদলের জন্য ছাড় দেওয়া প্রার্থীর পক্ষে কাজ করবেন না- এটাই স্বাভাবিক। বিএনপি নেতাকর্মীদের সহযোগিতা ব্যতিত ছাড় পাওয়া প্রার্থীরা সুবিধা করতে পারবেন না। এছাড়া বিপুল সংখ্যক মানুষ এখনও প্রার্থী নয়, প্রতীক দেখে ভোট দেন। নৌকা, ধানের শীষ, লাঙ্গল কিংবা দাঁড়ি পাল্লা প্রতীকের নির্দিষ্ট ভোট আছে। এই ভোটাররা অন্য প্রতীকে সাধারণত ভোট দেন না। নতুন আরওপি অনুসারে দলীয় প্রতীকে ভোট করতে হবে। শাপলা কলি নতুন প্রতীক। দলটির নেতারাও তরুণ। মাঠে তাদের অবস্থান শূন্যের কোটায়। মাঠ পর্যায়ে তাদের ভোট ব্যাংক নেই। সুতরাং বিএনপির ছাড় পাওয়া সত্ত্বেও স্বতন্ত্র কিংবা অন্যদলের প্রার্থী শক্তিশালী হলে এনসিপির বিজয়ী হওয়া খুবই কঠিন হবে। লেখক: উপদেষ্টা সম্পাদক, আন্দোলন ডটনেট।